top of page

আমরা বাঙালি # ৮ #

  • 17 hours ago
  • 4 min read

নতুন প্রজন্মের ছেলের সাথে বাঙালি বাবার মতের প্রচুর অমিল । আধুনিক মনস্ক বাঙালি, ছেলের সাথে বন্ধুর মতন মিশতে চেষ্টা করে । সিনেমা , কেন্দ্র-রাজ্য রাজনীতি, ট্রাম্প, ভেনেজুয়েলা, ইরান, শক্তিধর রাষ্ট্রের লাল চোখের মাতব্বরি, আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদের উপর মাতব্বর দেশ গুলোর লোভের কাহিনি - সব কিছু নিয়েই মতের আদান প্রদান হয় । বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মতের অমিলের জন্য বাঙালি বাবার মাঝে মাঝেই সন্দেহ হয়, হসপিটাল থেকে ছেলে পাল্টা পাল্টি হয়ে যায় নি তো?


ছেলে প্রথম বার ভোট দিয়ে পরিবর্তন ও এনে দিয়েছে। লাল জমানায় বড় হওয়া বাবার বিশ্বাস, বাংলার সব ঘরে ঘরে এই ভিন্নধর্মী মতবাদের জন্যই বাঙালি যৌথ ভাবে কোনও কিছুতেই সফল হতে পারছে না । গুজরাটি বাবা-ছেলের একসাথে ব্যবসা করা যতটা সাবলীল আর অবশ্যম্ভাবী,বাঙালি বাবা-ছেলের ব্যবসার যুগলবন্দী ঠিক ততটাই অলীক ভাবনা। এই পার্থক্যর মূল কারণ বোধহয় সাফল্যের অভাব । একটা সাফল্য পরের সাফল্যের বীজবপন করে। দিনের পর দিন লাল ফিতের জট খুলতে না পেরে, বাঙালি বাবারা তাঁর নিজের সন্তানের কাছে আর কোনও সাফল্যের উদাহরণ টানতে ব্যর্থ।


বাবা-ছেলের ফুটবল নিয়ে ভিন্নমতের কারণও বোধহয় সেই সাফল্যের পরিসংখ্যান।


বাবার ভালোলাগার ক্লাবের কোনও সাম্প্রতিক সাফল্য নেই যা ছেলেকে বাবার প্রিয় ক্লাব সম্বন্ধে প্রভাবিত করতে পারে। স্বভাবতই বাবা-ছেলের কোনদিন একসাথে আর খেলাও দেখতে যাওয়া হয়ে ওঠে নি। পূর্ব প্রজন্মের উদ্বাস্তু পরিবারের প্রতিনিধি হয়ে কলকাতার পার্শ্ববর্তী কলোনিতে শৈশব কাটানো মনে এখনও মনোরঞ্জন, ভাস্কর, কৃষাণু , বিকাশ ,সুদীপ, তরুণের ছবি ভাসলেও সেই ছবির কোনও প্রতিবিম্ব ছেলের চোখে দেখা যায় নি। বাবার প্রিয় ক্লাবের ব্যর্থতা দেখে দেখে বাবার উপর করুণা হলেও, বাবার দুঃখে সমব্যথী হবার মতন যথার্থ কারণ খুঁজে পায় নি ছেলে।


ছেলে বিদেশি ফুটবলের অনুরাগী । রাত জেগে চ্যাম্পিয়নস লীগ, সপ্তাহান্তের সন্ধ্যেতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখা অভ্যস্ত চোখে ও মনে ভারতীয় তথা বাঙালি ফুটবল আবেগের কোনও জায়গা নেই। নতুন প্রজন্মের বাঙালি রিটার্ন অফ ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে বেশ সচেতন। ছেলের প্রিয় দল বিগত দশ বছর ধরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অপ্রতিরোধ্য টিম। দশ বছরে ছ-বার লিগ জেতার সাফল্য। এবারেও আবার লিগ জয়ের দৌড়ে রয়েছে। লিগের শেষ পর্ব জমজমাট । বাবা ও ছেলে দুজনেরই। বাবার প্রাণের ক্লাবের সামনে মরীচিকার হাতছানি । বিগত ২২ বছরের আলেয়া আবার করে ফিরে এসেছে । হাতের মুঠোর মধ্যে ধরা দিতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে ভাগ্যের পরিহাসে ছিটকে গেছে ভারতীয় লিগ জয়ের মুকুট - একবার নয় । কম করে তিন, চার বার। এর সাথে সাথে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাশের ক্লাবের আকাশচুম্বি লিগ জয়ের সাফল্য। ভাগ্যিস, ছেলের দেশের ফুটবল নিয়ে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। ঘরের শত্রু বিভীষণের জন্ম টা রোধ করা গেছে।


বাংলার পরিবর্তনের রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতা ডার্বি । অনেকদিন বাদে আবার করে কলকাতা ফুটবলের নবজন্ম । রবিবাসরীয় খবরের কাগজের প্রথম পাতা তে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই ক্লাবের মহারণ নিজের জায়গা খুঁজে নিয়েছে । শেষ মুহূর্তে টিকিটের হাহাকারে বাবা টিকিট জোগাড় করতে না পেরে টেলিভিশনের পর্দা তে চোখ রেখেছে । ডার্বির আবেগ, উচ্ছ্বাস - বাবাকে ছুলেও ছেলেকে স্পর্শ করতে পারে নি । এমন কি , টিভির রিমোট কার দখলে থাকবে সেই নিয়ে ছোট করে একটা গৃহযুদ্ধও হয়ে গেল। একই সময়ে আইপিএল বিনোদন চলছে । বাবা-ছেলের লড়াইয়ে বাবা জিতে যায় মায়ের ভোট পেয়ে । ছেলেকে নিজের মোবাইলে খেলা দেখে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ভাবনার অমিল গুলো বাবা ছেলের সম্পর্কে চিড় ফেলছে না তো ?


সাতদিন বাদে সোমবার সকালের প্রাতরাশ সারতে সারতে ছেলের গম্ভীর ও ব্যথাতুর মুখ দেখে বাবার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে - ছেলের প্রিয় ক্লাবের লিগ জয়ের স্বপ্ন বোধহয় এই বছরের মতন ভঙ্গ হয়েছে। দু - চার কথার মধ্যেই জানা গেল বাবার আশঙ্কা অমূলক। গতরাতে ছেলের প্রিয় দল হেরে গেছে।


-“দুঃখ করিস না । সব সিজিনে তো আর চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না। সামনের বছর দেখবি ঠিক চ্যাম্পিয়ন হবে ।” - বাবা সান্ত্বনা দেয় ছেলে কে । ঠিক যে রকম ভাবে নিজের ক্ষত বিক্ষত হৃদয়ে প্রলেপ লাগিয়েছে বিগত বেশ কিছু বছর ধরে।


-“না, সামনের বছরের কথা ভাবছি না । অন্য নতুন টিম সাপোর্ট করবো তো ।” - ছেলের কথা তে চমকে ওঠে বাবা। একবার হারলেই দলবদল?


-“একটা টিমের ব্যর্থতার সময় , সেই টিমের পাশে দাঁড়ানো প্রকৃত সমর্থকের একটা নৈতিক দায়িত্ব । এই তোর ক্লাবের ভালোলাগা? এত ঠুনকো? “ - মৃদু শ্লেষের মধ্যে জীবনের মূল্যবোধের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় বাবা।


-“আমি ক্লাবের কোচের ফ্যান । আমার দৃষ্টিনন্দন ফুটবল দেখতে ভালো লাগে । আর এই কোচের জন্য ক্লাব ওই রকম খেলা উপহার দেয় । কোচ বলে দিয়েছে পরের সিজিনে আর এই ক্লাবে থাকবে না । তাই উনি যেই ক্লাবে যাবে , আমি সেই ক্লাবের সমর্থক হয়ে যাব। এর মধ্যে নৈতিকতার প্রশ্ন আসছে কেন?”


বাস্তববাদী নতুন প্রজন্মের কাছে “আবেগ” - চরিত্রের দুর্বলতা । জীবনের আনন্দ কে আবেগের পরিবর্তে যৌক্তিক ভাবে বিশ্লেষণ করতে শিখেছে।


-“একটা ক্লাব কে সমর্থন মানে শুধু মাত্র সেই ক্লাবের খেলা নয়, সেই ক্লাব কে নিয়ে বয়ে চলা সামাজিক অনুভূতি আর ইতিহাসের সরণি বেয়ে সেই ক্লাবের সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। নিজের অস্তিত্বের পরিচয় খুঁজে নেওয়া। মানুষের মনের গভীরে না ঢুকলে তাঁকে “ভালোবাসা” যায় না , মানুষের সৌন্দর্য শুধুমাত্র ভালোলাগা তেই আটকে থাকে।” - বাবার জ্ঞানের কথাগুলো ছেলের এক কান দিয়ে ঢোকা আর বেরোনোর জন্য।


ছেলের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, বাবার ও কি একই পরিণতি হবে ? বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যে। বাঙালি আজ টিকিট জোগাড় করতে পেরেছে। সহকর্মীর কাছে অফিসের টিফিনব্যাগ টা গচ্ছিত রেখে অফিস থেকে সোজা মাঠে। নিজের বাবা, কাকা, কলোনির সুভাষ জেঠু, নারায়ণ দাদু- এদের সবাই কে দেখেছে এই রকম অফিস ফেরত মাঠে গিয়ে লাল হলুদ আবির মেখে বাড়িতে ফিরতে। আজ বাঙালি কি আবার সেই রকম আবির মেখে মিষ্টির হাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে?


একশো মিনিটের উৎকণ্ঠা শেষ । থরথর করে আনন্দে শরীর কাঁপছে। উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে চোখমুখ । দীর্ঘ বাইশ বছরের শাপমুক্তি। না পাওয়ার যন্ত্রণা ও তাচ্ছিল্য কে ছিড়ে ফেলে মাথা উঁচু করে আজ বাঙালির গর্বের দিন। লাল-হলুদ আবিরে স্নান করে প্রমাণ করার দিন- ভালোবাসা হারিয়ে যেতে পারে না। আনন্দের স্রোতে ভেসে চলা সমর্থকের মধ্যে হটাৎ থমকে পড়ে বাঙালি। নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছে না । লাল-হলুদ আবির মেখে , ভালোবাসার ক্লাবের উত্তরীয় গলায় দিয়ে আনন্দের বন্যা তে যে ভাসছে সে কে ? নিজের ছেলে কে ঠিক চিনতে পারছে তো ?


-“তুই এখানে?” - এক দলা আনন্দ গলায় আটকে আসে।


-“সেদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে তোমার কথা গুলো শুনে আজ ভালোবাসা খুঁজতে এসেছিলাম। ভালোলাগা আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্যটা জানা খুব দরকার ছিলো” - আশেপাশের জনজোয়ারের গর্জনে চাপা পরে যায় এক নিশ্বাসে বলে চলা অনুভূতি গুলো।


ছেলেকে বুকের মধ্যে টেনে নেয় বাঙালি। ভালোবাসার সুনামি আজ সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ভালোবাসা আজ আবার প্রমাণ করল সে অমর। ভালোবাসার অনুচ্ছেদ হয় না। ভালোবাসা প্রবাহমান। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্ম।


Comments


©2020 by Hizibizi Online

bottom of page