আমরা বাঙালি # ৬ #
- 19 hours ago
- 3 min read

সদ্য জাঁকিয়ে পড়া শীতের ছোঁয়াচ আর কলকাতা । রোমান্টিকতা, প্রেম , ভালোবাসার উষ্ণ অনুভূতি নিয়ে শীতের নরম রোদ টা বাঙালি বরাবরই বেশ উপভোগ করে । যৌবনের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে সদ্য প্রৌঢ় এক বাঙালি অফিস ফেরত হটাৎ করে একটু বোহেমিয়ান হতে চেয়ে সহকর্মী কে নিয়ে গঙ্গার ধারে চা খেতে যাবার বায়না করেছে । বয়সে ছোট সহকর্মী বয়জেষ্ঠ্যর আবদারে কি করে আর না করতে পারে !!
রাত ১০ টা । শীতের রাতে গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়া টা বেশ কনকনে । শরীরে কষ্ট দিয়েও কিছু আনন্দ পাওয়া যায়। জিমে গিয়ে শারীরিক কষ্ট ছাড়াও আরও অনেক কিছুতেই বাঙালি আজকাল নিজেকে কষ্ট দেয়। কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে - বাঙালির কেষ্টলাভ হয়েছে এটা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই । গুড়, বাতাসা, ঘুঘনি, চপ ও এসেছে কেষ্টর সাথে।
মাত্র রাত দশটা তে কলকাতা ঘুমিয়ে পড়ছে এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বয়জেষ্ঠ্য বাঙালির। ভেবেছিল,রাতের গঙ্গার ধার বেশ সরগরম থাকবে। নতুন প্রেম না থাকলেও পুরনো দম্পতি, অথবা ছোট পরিবার নিয়ে বাবা-মায়ের দল , কেউ তো থাকবে । নিদেনপক্ষে আড্ডাবাজ কিছু মানুষ কে আশা করেছিল। খানিকটা হতাশ হয়ে সহকর্মীর সাথে কলকাতার এই রকম দৈন্যদশার কারণ খুঁজতে দুই বাঙালি বসে পরে এক কাপ চা নিয়ে।
কারণ খোঁজার অলি গলিতে ভালো করে ঢোকার জন্য আরও এক ভাঁড় চা লাগে। সহকর্মী আরও এক ভাঁড় করে চায়ের ব্যবস্থা করতে গিয়ে দেখে দোকানি ঝাঁপ ফেলতে ব্যস্ত।জনমানবশূন্য বাজারে শুধু শুধু নিজেকে কষ্ট দিয়ে কেষ্ট পাওয়ার কোনো আশা নেই এটা বিহারী দোকানি ভালো করে বুঝে গেছে। মনুষ্যত্ব এখনও বেঁচে আছে এটা প্রমাণ করার জন্য নাকি ফ্লাস্কের অবশিষ্ট চায়ের সদগতি হলো - কোনটা ভেবে দোকানি আরও দু কাপ চা দিয়ে গেলো সেটা নিয়ে দুই বাঙালিই একটু সন্দিহান।
শুনশান গঙ্গার ধারে দুজন মানুষের একসাথে বসে চা খাওয়ার মধ্যে কোনও অন্যায় না থাকলেও আইন রক্ষাকারীর কাছে এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া রাজ্য সরকারে পক্ষে আইনরক্ষার পিছনে প্রচুর খরচা করা বিলাসিতা আর তাই আইনরক্ষকদের সাবলম্বী হতে বলা হয়েছে। নিজের পেটের ভাত নিজেকেই জোগাড় করে নিতে হবে।
অলস ভাবে বয়ে চলা গঙ্গার ভাটার মতন শহরের নিশ্বাস প্রশ্বাস এর মধ্যে কেমন এক বিষাদের গন্ধ। শেষ চুমুক টা দিতে দিতে আবার করে মনে পরে গেল আগের সপ্তাহে ঘটে যাওয়া লজ্জাজনক ঘটনার কথা। ফুটবলের মক্কাতেই ফুটবল কে ঘিরে শহরের দৈন্যদশার আরও এক ছবি সুস্পষ্ট হলো ।উপযুক্ত সুযোগ ও পরিবেশের অভাবে যেমন কলকাতা থেকে মেধা পাচার হচ্ছে ঠিক সেই ভাবেই ফুটবলের সাথে বাঙালির ভালোবাসা পাচার হয়ে গেল হায়দরাবাদ , দিল্লি আর মুম্বইতে ।
আদর্শহীন লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার আর দুর্নীতির সোচ্চার উপস্থিতিতে বাঙালির জীবন কুয়াশাময়। ফাঁকিবাজ, আড্ডাবাজ, নিন্দুকবাজ - শত অপবাদ থাকলেও বাঙালি কে চোর- চিটিংবাজ বলার আগে বাঙালির চরম শত্রুও দু বার ভাবতো । বিগত বেশ কিছু বছরে অবশ্য বাঙালি চোর সুনাম টা বেশ উপভোগ করছে । গত সপ্তাহের দিনের আলো তে বাঙালির ফুটবল প্রেম টাও চুরি হয়ে গেল।
সে যাক গে ! অনেক কিছুই তো চুরি হচ্ছে । কোহিনুর চুরি হলো দেশ থেকে , নোবেল চুরি হলো শান্তিনিকেতন থেকে , কয়লা চুরি হলো খাদান থেকে। আর এ তো সামান্য ফুটবল চুরি। যে দেশের ফুটবলের জাতীয় লিগ ও চুরি হয়ে যায় রাজনীতির কাঁদাপাঁকে, সেখানে ফুটবল কে ঘিরে বাঙালির ছিচকাঁদুনি কে পাত্তা না দিলেই চলবে।
গত শতাব্দীর ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম একাদশে নব্বই শতাংশ বাঙালি আর সেখান থেকে এখনকার জাতীয় দলে টিমটিম করে উপস্থিতির সংখ্যা এক বা মেরে কেটে দুই । সেই খেলা নিয়ে এত ভাবার কি আছে ! তিতকুটে মন টা আরও একটু বেশি তেতো লাগছে প্রৌরের। অসহায় দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখতেও ভুলে গেছে গত বছরের পুজোর পর থেকে। আট থেকে আশি- স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক প্রতিবাদের খুন দেখেছে নিজের চোখের সামনে । ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালির ভোটের সমীকরণে ধর্ম এখন চলরাশি। পরিবর্তনের বাঘের পিঠে চেপে বাঙালি এখন ভাবছে পিঠ থেকে নামাবে কে ?
কষ্টের মধ্যে ভালো থাকার সঞ্জীবনী মন্ত্র খুঁজে পেতেই হবে ।বিশ্বাস আছে বাঙালির সব গৌরব চুরি হয়ে যাবে না । কিছু টা হলেও পরে থাকবে ধ্বংসের চিতার আগুনে না পুড়ে। বাড়ি ফেরার পথে শীতের চাদরে ঢাকা ময়দান কে দেখে প্রৌঢ় একটু স্বস্তি পায় - এই একটা জায়গা এখনও বাঙালির পুরনো স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনও আগের মতন বিশাল , সবুজের তারুণ্যে ভরপুর। বাঙালির অক্সিজেনের চিরন্তন সরবরাহকারী। মনের তেতো ভাব টা একটু একটু করে কমছে।
“ভাগ্যিস ময়দান টা আর্মির হাতে ছিল না হলে এটাও চুরি হয়ে যেত” - ফাজিল সহকর্মীর কথায় প্রাণখোলা হাসিতে কষ্ট নিয়েও আনন্দে থাকার সঞ্জীবনী মন্ত্র খুঁজে নেয় ময়দানের কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া বাঙালি!




Comments