আমরা বাঙালি # ৫ #
- Abhijit Chakraborty

- Dec 13, 2025
- 5 min read

রবীন্দ্রনাথ আড্ডা মেরে সময় নষ্ট করলে বাঙালি তাঁর একমাত্র জাতীয় সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতো - এই নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ না রেখেও বছরের পর বছর বাঙালি আড্ডা দিয়ে চলেছে , গর্বের সাথে ।
সারা সপ্তাহ ধরে অফিসের হতাশা , আক্ষেপ , বিদ্রুপ সহ্য করে সপ্তাহান্তে একটু আড্ডা না হলে জীবনে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় । এটা বাঙালি মনে প্রাণে বিশ্বাস করে । এই রকম বেশ কিছু সমভাবাপন্ন বাঙালি বিগত পঁচিশ বছর ধরে প্রতি শুক্রবার নিয়ম মেনে অক্সিজেন নিয়ে চলেছে । কলেজ জীবন থেকে শুরু । মাঝে প্রেম, বিরহ, বিয়ে , সন্তান , সন্তানের পরীক্ষা, অফিসের চাপ , পারিবারিক অশান্তি , মানসিক অবসাদ , প্রিয়জনের বিদায় - নদীর মতন করে জীবন এগিয়ে চলেছে। শুধু শুক্রবার ধ্রুবক । গড়পড়তা জনা বারো হলেও, আজকের আড্ডার উপস্থিতি আট। শুরুর দিকের জড়তা কাটিয়ে আড্ডা তার নিজের নিয়মে উপভোগ্য হয়ে উঠছে।
আজকের আড্ডার বিষয় - বাঙালির পদবি ।
শশাঙ্ক থেকে শুরু করে পাল বংশ , সেন বংশের হাত ধরে প্রচুর পদবি নিয়ে বাঙালি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছে বিগত পনেরোশো বছর ধরে। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বাঙালি পদবি নিয়ে আজ যুযুধান তর্ক । কার মাথায় উঠবে শ্রেষ্ঠ পদবির রাজমুকুট?
যে কোনও লড়াইয়ের একটা নিয়ম লাগে । আটজনই সর্বসম্মত ভাবে সংখ্যার ওজনের থেকে সামগ্রিক ভাবে সমাজ প্রভাবিত করার ক্ষমতাকে পদবি লড়াইয়ে মুখ্য নির্ধারক হিসেবে গণ্য করতে সহমত । একই পদবির বিখ্যাত বাঙালির সমষ্টিগত তালিকার চেয়ে কিংবদন্তি বাঙালি পদবি অগ্রাধিকার পাবে জয় পরাজয়ের মাপকাঠি নির্ধারণে ।
"ব্যানার্জী' !!! বাকিরা ধুয়ে মুছে সাফ! - আট বাঙালির এক বাঙালি প্রত্যয় গলায় তাঁর নিজের পদবি কে জয়ী বলে দাবি জানানোর পরক্ষণেই বাকি সাত জন তীব্র আপত্তি জানান দিয়ে, “রায়” কে ব্যানার্জির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বাঙালি ব্যানার্জির ধর্মসঙ্কট ! এই আড্ডার সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ তো “রায়”, সত্যজিৎ রায় । সাথে সাথে বায়না, উপেন্দ্রকিশোরের বংশ কে বাইরে রাখতে হবে। আড্ডাকে আরও উত্তেজক করে তুলতে বাকি সাত জন সুকুমার রায় ও তার ছেলেকে রিজার্ভ বেঞ্চে রেখেও লড়াইয়ে প্রস্তুত।
বিদ্যাসাগর , ব্যাস আর কি! - অবহেলায় বাঙালি ব্যানার্জি আবার জয়ের দাবি তুলেছে। সমাজ সংস্কারক সাহসী বাঙালির বর্ণপরিচয় দিয়েই তো আজকের বাঙালির শিক্ষার হাতেখড়ি। রাজা রামমোহন রায়, হাসতে হাসতে উত্তর এল। বাঙালির নবজাগরণের জনক বিদ্যাসাগরের প্রতিদ্বন্দ্বী ।
ব্যানার্জি বাঙালি এই বার একটু সতর্ক । লড়াই টা একটু বিস্তৃত করতে হবে। সাহিত্য, কবিতা, সিনেমা, চিত্রশিল্প, খেলা, ব্যবসা, নাটক আর গান - এই আট বিভাগে লড়াই টা ছড়িয়ে দিলেই কেল্লা ফতে। সব বিভাগেই “ব্যানার্জি” আছে , কিন্তু সবখানে তো আর “রায়” নেই । মুচকি হেসে ব্যানার্জী বাঙালি জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেছে ।
বায়না করে উপেন্দ্রকিশোরের উত্তরাধিকারীদের এই প্রার্থী নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ায় সাহিত্য বিভাগে অবলীলায় তারাশঙ্কর আর বিভূতিভূষণের হাত ধরে ব্যানার্জি ১-০ তে এগিয়ে গেল। তারাপদ রায়ের পক্ষে ১-১ করা সম্ভব নয় । সাহিত্যের পরাজয় কে চ্যালেঞ্জ না করে ঠান্ডা মাথায় অন্নদাশঙ্কর কে দিয়ে এবার রায় গোষ্ঠী ভালো চাপ তৈরি করেছে । কিংবদন্তি কোনও ব্যানার্জি কবির খোঁজ না পাওয়ায় খেলার ফলাফল এখন ১ - ১।
সিনেমায় জহর রায়ের সামনে ভানু ব্যানার্জি কে প্রার্থী করে, সিনেমায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও এগোনো গেল না । রেফারির আদেশ ভানু আর জহর খুব ভালো বন্ধু , অথএব ওদের মধ্যে কোনও হারা জেতা রাখা যাবে না। রেফারির আদেশ মেনে ব্যানার্জি বাঙালি হাতড়ে বেড়াচ্ছে বাঙালির মনে আলোড়ন তোলা অভিনেতার সন্ধান পেতে। এরই মধ্যে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মাঝমাঠ থেকে উঠে এসে বিকাশ রায় গোল করে এগিয়ে দিল, ২ - ১। ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না । বিকাশ রায় ? ছবি বিশ্বাস কে নিজেদের বংশগোত্র করার কোনও সুযোগ থাকলে রায় গোষ্ঠী কে উচিত জবাব টা দেওয়া যেত । একটু সিগারেটের বিরতি দরকার মাথা টা পরিস্কার করার জন্য ।
বিরতির পরেই যামিনী রায়ের সামনে কোনও জুতসই প্রার্থী দিতে না পেরে ব্যানার্জি এখন একটু চিন্তায় পড়েছে । ৩ - ১ য়ে এগিয়ে গিয়েছে “রায়”। ভেঙে পড়লে চলবে না । আরও চারটে বিভাগ বাকি আছে । পলাশী অনেক দূর ।
পি কে ব্যানার্জীর ভোকাল টনিক বাউন্সারে সর্বভারতীয় বাঙালি ক্যাপ্টেন পঙ্কজ রায় ধরাশায়ী । এর সাথে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সুরের মূর্ছনায় সমগ্র রায় গোষ্ঠীকে আবৃত করে ফেলেছে । খেলা ও গানের উপর ভর করে আবার করে লড়াইয়ে সমতা ফিরে এসেছে। হাড্ডাহাড্ডি খেলার ফলাফল ৩ -৩। পদবির রাজমুকুট যে কোনও সময় ব্যানার্জি ছিনিয়ে নেবে।
ব্যবসাতে বাঙালির সাফল্য নিয়ে সন্ধিহান আটজন ই । সফল বাঙালি ব্যবসায়ী খুঁজতে গিয়ে আড্ডার পরিবেশ উত্তপ্ত । প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের হাত ধরে বাঙালি ব্যবসায় নেমেছিল কিন্তু পরবর্তী কালে যত দিন গেছে , শাহ, শর্মা, সিং দের সাথে লড়াইয়ে বাঙালি দূরবীন লাগিয়েও কোনও ব্যানার্জি খুঁজে পায় নি। মাথা নিচু করে আবার করে পিছিয়ে পরে ব্যানার্জি বাঙালি। আর মাত্র একটা বিভাগ! শেষ রক্ষা হবে কি ?
শেষ অঙ্কে নাট্যমঞ্চে প্রবেশ করলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় !!! যেহেতু যুদ্ধ টা রায়ের সাথে, তাই “মিত্রর” প্রার্থী হবার সম্ভাবনা নেই । ব্যানার্জী বাঙালি প্রবল পরাক্রমে লড়াইয়ে ফিরে এসেছে । সমতা ফিরবেই। হুঙ্কার ওঠে, কি রে তোদের কে আছে রে আমাদের বাঘের বাচ্চার সাথে টক্কর দেবে? ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করছে ফাইনাল বাঁশি বাজবে বলে। হটাৎ করে একটা হালকা স্বরে শোনা যায় - ডি এল রায়। সে আবার কে রে, বলতে গিয়ে ঢোক গেলে ব্যানার্জি বাঙালি। এ তো কিংবদন্তি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়! বায়নাবাজ বাঙালির পক্ষে এই রকম ভাবে নাটুকে পরাজয় মেনে নেওয়া অসম্ভব । সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিবাদ চালু হয়। ডি এল রায় নাট্যকার ছিলেন , অভিনেতা ছিলেন না , এই অভিযোগে প্রার্থীপদ বাতিলের দাবি ওঠে । রায় গোষ্ঠী এই দাবি মানতে নারাজ । তুমুল বিতর্কের শেষে পুরো নাটক বিভাগ লড়াই থেকে বাদ !
এই যুদ্ধে জিততেই হবে যে কোনও মূল্যে। ব্যানার্জি বাঙালি খুঁজতে থাকে এমন কোনও বংশের উত্তরাধিকারী, যার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বাঙালি মননে ! দুটো নাম মাথায় ঘুরতে থাকে - রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দ । চ্যাটার্জী আর দত্ত ভাগ্যিস আজ এই লড়াইয়ে নেই ।
যুদ্ধ জেতার জন্য কি তাহলে শেষমেশ তাঁর শরণাপন্ন হতে হবে ?
প্রথম থেকেই নাম টা মাথাতে ছিলো , কিন্তু কিছুতেই মন চায় নি। ওনার আলোতে নিজেদের বংশকে আলোকিত হবে , এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। অর্জুন কে দেওয়া কৃষ্ণের শাশ্বত বাণীকে প্রণাম জানিয়ে ব্যানার্জী বাঙালির কুটনীতির শেষ প্রচেষ্টা - রাজনীতি কে নাটকের পরিবর্তে লড়াইয়ে নামিয়ে দেওয়া সম্ভব কি ?
ব্যানার্জী বাঙালির শেষ প্রস্তাবও রায় গোষ্ঠী মেনে নিলো কোনও প্রতিবাদ ছাড়াই । তাহলে কি ওনার থেকেও প্রভাবশালী ও সর্বগুণসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও মুখ্যমন্ত্রী বাঙালি এর আগে কাউকে পেয়েছে ? নাহলে এই রকম বিনা আন্দোলনে লড়াইয়ের জমি ছেড়ে দেওয়া? ব্যানার্জী বাঙালি এবার একটু সন্ত্রস্ত।
দল মত নির্বিশেষে বিধান রায় কে বাঙালি রূপকার হিসেবে গ্রহণ করেছে এটা মাথায় রাখা উচিত ছিলো। রায় গোষ্ঠী এর সাথে আবার হালকা করে মানবেন্দ্র নাথ রায় কেও এগিয়ে দিয়েছে, রাজনীতির দাবা খেলায়। বামপন্থী ব্যানার্জী বাঙালির করুন অবস্থা। প্রিয় দলের প্রতিষ্ঠাতা যে রায় বংশের কৌলীন্য বজায় রাখতে এগিয়ে আসবে সেটা ঘূর্ণাক্ষরেও মাথায় আসে নি। কিন্তু বিধান বাবু বা মানবেন্দ্র বাবু কি ওনার মতন এত গুণের অধিকারী ছিলেন? গলার জোর কমে আসছে । তাও যদি একবার চেষ্ঠা করা যায় !!! একজন মানুষের অনুপ্রেরণা তে যদি একটা সমাজ পুরোপুরি পরিবর্তিত হতে পারে তাহলে সে রামকৃষ্ণ বা বিবেকানন্দের থেকে কম কোথায় ? নিজের বিবেকের সাথে ছায়াযুদ্ধের শেষে মনের ভাবনা মনের মধ্যেই থেকে গেলো । পুরুর মতন যুদ্ধে হারার ও একটা গৌরব আছে , কলঙ্কিত মুকুট কে গ্রহণ করার থেকে।
রায় গোষ্ঠীর নির্বাচন জেতার আবহেও ব্যানার্জি বাঙালি ভেবে চলেছে , কিছুতেই কি এই অসম যুদ্ধ যেটা সম্ভব নয় ? মাথা নিচু করে দাবার শেষ চাল ভাবতে থাকে বাঙালি।
ইউরেকা ! ইউরেকা ! ইউরেকা !
শীতের রাতে উলঙ্গ হয়ে রাস্তাতে দৌড়তে ইচ্ছে করছে ব্যানার্জী বাঙালির। বিশ্বজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্মানের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের পরাক্রমী প্রেসিডেন্টের মরণ কামড়ের সূত্র ধরে ব্যানার্জি বাঙালির কিস্তিমাত ! রবীন্দ্রনাথের পর নোবেল প্রাইজ পাওয়া বাঙালির সংখ্যা তো হাতে গোনা! আর সেই তালিকায় জ্বলজ্বল করা অভিজিৎ ব্যানার্জি । আড্ডার কফিনে শেষ পেরেক মেরে সিগারেটের সুখটান টা আগামী এক বছরের অক্সিজেন এনে দিলো!
ভাগ্যিস নোবেল প্রাইজ টা ছিলো - জীবনের পঞ্চাশ বছরে নতুন করে পদবি পাল্টাতে হলে লজ্জার শেষ থাকত না ! যুদ্ধে জেতা টা ব্যানার্জীর কাছে এখন জলভাত! রায় তো একটা উপাধি । কত “রায়ের” মধ্যে কত “ব্যানার্জি” লুকিয়ে আছে তার খবর কে রাখে ! বিকাশ ব্যানার্জি, অন্নদা ব্যানার্জি হবার সম্ভাবনা কম নয় । নেহাত ঠাকুর উপাধির পেছনে "কুশারী' টা অনেকেই জানে , না হলে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় যুদ্ধ জয় ।




Comments